জার্মানিতে স্কলারশিপ পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনের প্রক্রিয়া: রেহানুল হকের অভিজ্ঞতা

ঘাসফুল
ছবি কৃতজ্ঞতা: নুর কেয়াত (Nur Kayat)

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে জার্মানি এসেছিলাম। কুয়েটে থাকা অবস্থায় আমার এই দেশে আসা নিয়ে কোন আগ্রহ ছিলোনা। ৪র্থ বর্ষে থাকা অবস্থায় চেয়েছিলাম সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে ২০১৫ তে কুয়েট থেকে বের হবার পর বেসরকারি চাকরিতে জয়েন করি। বেসরকারি চাকরিতে জয়েন করার পর একবার ভাবলাম জিআরই দিয়ে ইউএসএ যাই। কিন্তু কাজের প্রেশারেই হোক অথবা আমার আলসেমিতেই হোক জিআরই আর দেয়া হয়নাই। শেষমেশ রেনাটাতে জব করা অবস্থায় এক কুয়েটিয়ান কলিগকে দেখে এই দেশে আসার ব্যাপারে আগ্রহী হই।

জার্মানিতে তে আসার জন্য সবার আগে যেটা লাগবে সেইটা হইলো আইইএলটিএস। এখানে যত বেশি স্কোর করা যাবে তত বেশি ভালো, তবে মিনিমাম ৬.৫ এর নিচে না আসাই ভালো। আমরা যারা ইঞ্জিনিয়ার আছি তাদের ১-৩ মাসের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত হওয়ার কথা। আমি নিজে ইউটিউব এর কিছু চ্যানেল ফলো করতাম, বই কিনে এনে নিজেই বাসায় পড়তাম । আর সপ্তাহে একদিন মকটেস্ট দিতাম।

এর পরে যেটা লাগবে তা হচ্ছে ব্যাচেলর এর রেজাল্ট। এই দেশের একটা প্রবলেম হচ্ছে এরা বাংলাদেশের সব ভার্সিটি কে এক লেভেল এর মনে করে। মানে তুমি কুয়েট থেকে ৩.০০ রেজাল্ট নিয়ে বের হইছো আর আরেকজন এক অখ্যাত ভার্সিটি থেকে ৩.৫০ নিয়ে বের হইছে, তো এদের কাছে ৩.৫০ এর ছেলে/মেয়েটাই বেশি মেধাবী। সুতরাং রেজাল্ট যত বেশি ভালো করা যায় ততো ভালো, ৩.০০ নিয়েও অনেকে আসে, তবে আমার মনে হয় ৩.২৫ থাকলে সেফ সাইডে থাকা যায়।  

উপরের দুইটা হাতে থাকলেই ভর্তির জন্য আবেদন করা যাবে। এই দেশে দুই সেমিস্টার। সামার আর উইন্টার। সামারে এপ্রিল থেকে আর উইন্টারে অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু হয়। এই ক্লাস শুরুর আগের প্রায় ৬ মাস আগে থেকে আবেদন করা যায় আর শেষ হবে তিন মাস পরে। মানে উইন্টার সেশন ধরার জন্য মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। তবে এইটা ভার্সিটি টু ভার্সিটি অনেক ভ্যারি করে। আর একটা টিপস হচ্ছে তারাতারি আবেদন করবা, কারণ যত আগে আবেদন করা যায় অফার লেটারের সম্ভাবনা ততোই বেশি হবে। কুয়েট এ যেসব ডিপার্টমেন্ট আছে সবগুলার চাহিদাই এই দেশে কমবেশি আছে। তবে তুমি যেই সাবজেক্ট পছন্দ করলা ওইটা থেকে পাশ করার পর জব এর চাহিদা কেমন হবে ওইটার জন্য ওই সাবজেক্ট এর সিনিওর দের সাথে কথা বলে নেয়া ভালো। নিজের সাবজেক্ট খোঁজার জন্য নিচের লিংক খুবই কাজের-    

সাবজেক্ট খুঁজে পেলে আবেদন করার দুইটা উপায়। আমার মনে হয় প্রায় ৮০% ভার্সিটিতে আবেদন করার জন্য https://www.uni-assist.de/en/ নামের এই পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে। ওই পোর্টাল এ গিয়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেনটস আপলোড দিতে হবে। তারপর ওরা সেটা ওকে বললে বাংলাদেশ থেকে তোমাকে ওই সব ডকুমেনটসগুলার  নোটারি পাবলিক দিয়ে সত্যায়িত ফটোকপি জার্মানিতে পাঠাতে হবে। তারপর কিছুদিন পর আপডেট দিয়ে দিবে ওরা। আর বাকি ২০% ভার্সিটির আছে নিজস্ব পোর্টাল। সেম প্রছেস শুধু অন্য পোর্টাল।

অফার লেটার পেলে এখন ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। এর জন্য অফার লেটার এর সাথে লাগবে Blocked Account!! আমাদের সময় এটা ছিল ৮০০০ ইউরো, এখন মনে হয় ১০০০০ ইউরো প্রায়। মানে বাংলাদেশ থেকে তোমাকে জার্মান একটা ব্যাংক এ তোমার নামে একাউনট খুলতে হবে, যেখানে তুমি ওই ১০০০০ ইউরো সেন্ড করবা এবং তুমি জার্মানি আসলে ওই ১০০০০ ইউরো তোমাকে ১২ মাস ধরে ব্যাক দিবে। মানে প্রতিমাসে ৮৩০ ইউরো করে দিবে, অনেকটা আমাদের দেশের আইইউটি এর মতো। তার মানে দাঁড়াচ্ছে জার্মানি আসার আগে তোমাকে প্রায় ১২/১৩ লক্ষ টাকা হাতে রাখতে হবে। এর ভেতর ১০ লক্ষ তুমি ফেরত পাচ্ছ আর বাকিটা বিমান ভাড়া, কেনাকাটা এসবে চলে যাবে। একটা স্কলারশিপ আছে যেটা তুমি বাংলাদেশ থেকেই আবেদন করতে পারো। তবে এর জন্য তোমাকে বাংলাদেশে সাবজেক্ট রিলেটেড ২ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

https://www2.daad.de/deutschland/stipendium/datenbank/en/21148-scholarship-database/?status=3&origin=190&subjectGrps=F&daad=&intention=&q=&page=1&detail=50076777

এই স্কলারশিপ পেলে তোমাকে আর ব্লকড এর টাকা দেখাতে হবে না। আর স্কলারশিপ না পেলে, অনেকের জন্য এই টাকা জোগাড় করা অসম্ভব, আমার কাছেও অসম্ভব ছিলো। আমি পুরা টাকাটাই ধার করে আসছিলাম। আসার পর প্রথম ৬ মাস কোন জব করিনাই, মানে বসে বসে আমার ব্লকড একাউনট এর টাকা দিয়ে চলেছিলাম। তারপর থেকে পার্ট টাইম জব করা শুরু করি, আর ব্লকড এর বাকি টাকা গুলা দেশে ফেরত দিতাম। তবে এইখানে একটা রিস্ক আছে তা হইলো, জার্মানি আসার ১/২ বছর পর তোমাকে আবার ভিসা বাড়ানোর (Aufenthaltserlaubnis) জন্য আবেদন করতে হবে। তখন তোমাকে হয় কোন পার্ট টাইম জবের কন্ট্রাক্ট দেখাতে হবে অথবা তোমার কাছে ১০০০০ ইউরো থাকতে হবে অথবা ১০০০০ ইউরো আবার ব্লকড করতে হবে। মানে তিনটা উপায় আছে, যা সিটি টু সিটি ভ্যারি করে। ৯০% সিটিতে শুধু পার্ট টাইম জব থাকলেই ভিসা বাড়ানো যায়, কিন্তু বাকি ১০% এর জন্য ব্লকড একাউনট করতে হবে আবার!!  এই জন্য তুমি যে সিটিতে আসবা ওইটা কি এই বাকি ১০% এর ভেতর কিনা তা আগেই জেনে নিবা।   

ছাত্র অবস্থায় তোমার মাসে খরচ হবে মিনিমাম ৪০০ ইউরো থেকে ৬০০ ইউরো। আর তুমি পড়াশোনার ক্ষতি না করে সহজেই ৬০০-৮০০ ইউরো ইনকাম করতে পারো। জার্মানি আসার প্রথম ২/৩ মাস হয়ত জব করতে পারবানা, আর ব্লকড এর প্রথম টাকা মানে ওই ৮৩৩ ইউরো ১ মাস পরে থেকে পাওয়া শুরু হবে। সুতরাং মিনিমাম ২ মাসের চলার মতো ব্যাকআপ তোমার লাগবে। বড় শহরগুলাতে খরচ একটু বেশি কিন্তু জবের সুযোগও অনেক বেশি। তাই আমি বলবো বড় শহর গুলাই ভালো। ছাত্র অবস্থায় কাজ পাবার জন্য যে জিনিষটা তোমায় সাহায্য করবে তা হচ্ছে জার্মান ভাষা। তুমি যদি জার্মান পারো তবে এরা তোমায় মাথায় তুলে রাখবে। ভারতীয়, এরাবিয়ান আর অন্য দেশের যারা তারা এই দেশে আসার আগেই ভালো জার্মান শিখে আসে। আমি বলবো কেউ যদি কুয়েট এর লাস্ট ইয়ার এর ৬ মাস প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করে ইউটিউব দেখে জার্মান শেখে তবে তার আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবেনা। শুধু জার্মান আর বাংলাদেশের সার্টিফিকেট দিয়েই জব পাওয়াও সম্ভব এই দেশে, এরকম উদাহরণ অনেক আছে এই দেশে। তাই আমি বলবো জার্মানিতে আসার জন্য জার্মান শিখা হচ্ছে টপ প্রায়োরিটি।     

মাস্টার্স শেষ করার নিয়ম হচ্ছে ২ বছর, কিন্তু অধিকাংশই ৩ বছরে শেষ করে আর ৪ বছরের ভেতর শেষ না করলে ভার্সিটি থেকে ঝামেলা করবে। মাস্টার্স শেষ করলে তুমি পিএইচডি (এইটা এই দেশে ফুল টাইম জব হিসেবে কাউন্ট হয়) অথবা জব করতে পারো। তোমাকে এরা তোমার ফিল্ড রেলেটেড জব খোঁজার জন্য ১৮ মাসের ভিসা দিবে। এর ভেতর তুমি যদি রিলেটেড ফুল টাইম জব পাও, তাহলে সেই ফুল টাইম জব পাবার ২৪ মাস পর পিআর (Niederlassungserlaubnis) এর জন্য আবেদন করতে পারবা। আর মাস্টার্স এর পরে ইয়ারলি বেতন শুরু হবে ৩৬০০০ ইউরো থেকে ৫০০০০ ইউরো। এর বেশি অথবা কম ও হতে পারে জবের লোকেশন আর কোম্পানির উপর ভিত্তি করে। তবে যে বেতনটা লিখেছি তা কিন্তু ট্যাক্স আর হেলথইনস্যুরেন্স সহ। সব কিছু কাটার পর ৬৫%-৭২% হাতে থাকবে। পিআর পাবার পর সুবিধা হচ্ছে যদি কখনো জব চলে যায় তবে সরকার থেকে মাসে মাসে তোমাকে টিকে থাকার জন্য টাকা দিবে আর পরবর্তী জব পেতে সাহায্য করবে। আর অবসরকালেও মাসে মাসে একটা এমাউন্ট পাওয়া যাবে।   

২০২২ এ নতুন সরকার আসবে। গত সপ্তাহে ওনারা ঘোষণা দিয়েছেন যে, এখন থেকে ডুআল পাসপোর্ট এলাউড আর জার্মানিতে থাকার ৫ বছর পরেই জার্মান পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করা যাবে। আগে ডুআল পাসপোর্ট বৈধ ছিলোনা আর পাসপোর্ট এর জন্য মিনিমাম ৮ বছর লাগতো। আর এই দেশে টেকনিক্যাল লোকদের প্রচুর চাহিদা আছে আর সামনে আরো হবে। তো সবদিক বিবেচনা করলে জার্মানিতে ফিউচার খুব একটা খারাপ হবার কথা না। তবে যেহেতু রিভিউ দিচ্ছি সেহেতু কিছু নেগেটিভ বিষয় নিয়েও বলি। এক হচ্ছে পুরা ইউরোপ জুড়েই ফার রাইট  পলিটিকাল পার্টিরা সামনে আসছে। জার্মানির পূর্ব দিকের কিছু অঞ্চলে এরা এখন অনেক পপুলার। দুই হচ্ছে রেসিজম। ছোট শহরগুলাতে কিছু ফিল করতে পারবা। কিন্তু যেসব শহরে ভার্সিটি আছে অথবা যেসব শহর বড় সেখানে নাই বললেই চলে। আর শেষেরটা হচ্ছে আমার ব্যক্তিগত। এই দেশের ধর্মীয় আর সামাজিক অনুশাসন আমাদের থেকে আলাদা। তাই পরবর্তী জেনারেশন কে নিজের ধর্মীয় আর সামাজক অনুশাসন এ রাখতে হলে অনেক বেশি ইফরট দিতে হবে।

তো যাইহোক, আমি যা জানতাম তাই নিয়ে লিখলাম। হালনাগাদ তথ্য পাবার জন্য অবশ্যই ইন্টারনেট এর সাহায্য নিবা। সবার জন্য শুভকামনা।

লেখক সম্পর্কে:
রেহানুল হক
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার,
LACKNER GU SÜD GmbH,
মিউনিখ, জার্মানি।

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Popular Post

Recent Comments